নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পিপিএম (বার) হয়ে ওঠার গল্প বাবা মায়ের কারণেই আজ আমি এসপি

0

সোনালী দিন ডেক্স : আমার এসপি হয়ে ওঠার পিছনে রয়েছে আমার বাবা মায়ের সীমাহিন কষ্ট আর ফেনির-গ্রামের কর্দমাক্ত মেঠোপথের না বলা এক ইতিহাস। আমাদের আশেপাশের কয়েক গ্রামের অনেক ছেলেমেয়ের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছে। কিন্তু আমার ভাগ্যের নির্মম পরিহাস একসময় বাবা-মায়ের মনেই হয়েছিল ছেলের কি নিরক্ষর থাকতে হবে? প্রায়ই মায়ের চোখে শ্রাবণের বৃষ্টির মত অশ্রু ঝরতে দেখেছি। বাড়ী থেকে সামান্য হতে বই হাতে ফিরে এসেছে ছেলে, স্কুলে যায় নি। এভাবেই আষাঢ়-শ্রাবণ-ভাদ্র পেরিয়ে আবারও আষাঢ় আসে। বাবা মা-ছেলের দৈনন্দিন রুটিনের পরিবর্তন নাই। রাতে বিছানায় বাবা মা ছেলেকে বোঝায়। সকালে ছেলে সব ভুলে যায়। মা হাল ছাড়েন না। নাছোড়বান্দা মায়ের নিরলস চেষ্টায় ধীরে ধীরে ছেলে স্কুলমুখী হয় । ছেলেটি পড়াশুনায় কিছুটা মনোযোগী হয়। ধীরে ধীরে ছেলে পাঠ্যপুস্তকের সকল বিষয়ে পাকা হয়ে যায়। শিক্ষকেরা বলতে শুরু করেন ছেলেটা অনেক মেধাবী। বাবা-মায়ের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সোনালী স্বপ্ন তাঁদের চোখে-মুখে বাসা বাধতে থাকে। এক সময় ছেলেটা কাসে ফার্স্ট হতে শুরু করে। ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষা দেয়। গ্রামে গত পঞ্চাশ বছরে কেউই বৃত্তি পায়নি। ছেলেটা প্রাথমিক পরিক্ষা সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হয় এবং বৃত্তি পায়। সুনাম ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। বাবা-মায়ের চোখ আন্দন্দের অশ্রুজল। স্কুলে বেতন দিতে হয় না, উল্টো ছেলে সরকারী টাকা পায়। টানাটানির সংসারে এর চেয়ে সুখের আর কি থাকতে পারে। জুনিয়র পরিক্ষা বৃত্তি পাবে আশা ছিল সকলেরই। পরীক্ষার হলে ইনভিজিলেটরও বলেছিল খাতা ছেলেটা বৃত্তি পাবে। সবার অনুমান বাবা-মায়ের আশা-তাতো আর মিথ্য হতে পারে না। অবশেষে জুনিয়র পরিক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিপায় ছেলে। মা-বাবার আশা ছিল স্থানীয় কলেজ থেকে পাশ করে ছেলে গ্রামের স্কুলের মাষ্টার হয়ে মায়ের চোখের সামনেই থাকবে। ছেলে বেঁকে বসে, ঢাকা কলেজে পড়বে। মা কিছুতেই রাজী না। স্বল্প শিক্ষিত বাবা অবশ্য ছেলের পক্ষ নেন। ছেলে এসএসসি পাশ করে। এবার কলেজে ভর্তির পালা আসে। সহজ সরল বাবা-মার ভিতরে ভিতরে অনেকটাই নার্ভাস। ঢাকায় অনেক খরচ, কি করে চালাবেন। নিজের জীবনের চেয়েও আদরের ছেলে। ছেলের খুশিই তো মা-বাবার খুশী। মা রাজী হন। বাবা-মা সংসারের আর্থিক টানাপোড়ন নিয়ে আড়ালে আবডালে আলোচনা করেন। পড়াশুনা করার পরামর্শ ও দেয়। ছেলে ঢাকায় ভর্তি হয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে চিঠি লেখেন মা-বাবাকে। প্রতিমাসেই বাড়ি আসে ছেলে। ঢাকায় ছেলের বেতন লাগে। থাকা-খাওয়ার খরচ আছে। ঘোড়ার আগে গাড়ি কেনার মতই গোপনে গোপনে বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকে ছেলে। পরীক্ষার সার্কুলার হয়, পরীায় অংশগ্রহণের যোগ্যতাও ইতোমধ্যে হয়ে গিয়েছে। ফার্স্ট চয়েজ পুলিশ দিতে চায়। চৌদ্দ গোষ্ঠির মধ্যে কেউ পুলিশের চাকরিতে নাই। পুলিশে ঢুকলে মানুষ নষ্ট হয়ে যায় এমন ধারনা বাব-মায়ের। শত কষ্টের নয়নের মনি একমাত্র ছেলের এমন ভবিষ্যত মা-বাবা কিছুতেই মেনে নেবেন না। ছেলেরও জিদ সে পুলিশেই যোগদান করবে, এবারও সেই সহজ সরল বাবা এগিয়ে আসেন। একটির পর একটি ধাপ পেরিয়ে চূড়ান্ত ফল বের হয়। টাঙানো নোটিস বোর্ডে নিজের রোল নম্বর খুঁজতে থাকে। পুলিশ ক্যাডারেই খোঁজে। নিচের দিক থেকে খুঁজতে খুঁজতে না পেয়ে এক সময় হতাশা বাড়তে থাকে। এতো হতেই পারে না, পরীক্ষা অনেক ভালো হয়েছে। উপরের দিকে প্রথম রোলটা দেখে নিজের বিশ্বাসের উপর সন্দেহ হয়। ভুল দেখছি না তো! সহপাঠিকে দেখতে বলে, নিজেও পকেট থেকে এ্যাডমিট কার্ড বের করে যাচাই করার জন্য। না, সত্যিই তো রোল নম্বর মিলে যাচ্ছে! প্রথম হয়েছে! পরের দিন চোখে-মুখে এক জয়ের আনন্দনিয়ে বাড়িতে ফিরে আসে ছেলে , অনেকক্ষন বাবা-মায়ের পাশে বসে থাকে। স্বপ্নের চাকুরীতে জয়েন করে। দিন, মাস, বছর গড়ায়। ধাপে ধাপে ছেলেরও পদ বাড়ে। সেই ছেলে আজ পুলিশ বিভাগের উচ্চ পদে। এত গুলো বছর গড়িয়েছে, বদলে গেছে অনেক কিছুই। বাবা-মায়েরও বয়স বেড়েছে, নানান রকম রোগ শরীরে বাসা বেঁধেছে। বদলাননি সন্তানের প্রতি মা-বাবার চিন্তা। সন্তান যতই বড় হোক এখনো তাঁদের কাছে সেই অবুজ ছোট্ট খোকন শোনা। কাজের চাপে বাসায় ফিরতে দেরি হলে মা-বাবা ঘুমান না, ফোন করে তাড়া দেন। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় মা বলেন, ‘সাবধানে যা, সাথে লোক আছে তো?’ হরতাল হলে মা-বাবা বলেন, ‘এই গোলমালের মধ্যে অফিসে সাবধানে যাস।’ ছেলে হাসে, মা-বাবাবে বোঝায়, গোলমালে পুলিশের দায়িত্ব বাড়ে। এখন টিভি খুললেই ছেলেকে দেখা যায়, মা ফোন করেন, ‘তোর মুখটা এতো শুকনা কেন?’ খাবার টেবিলে মা বলেন, ‘এতো কম খাইলি?’ মায়ের সামনে পড়লেই মা বলেন, দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছিস, তোর কোন অসুখ-বিসুখ হয় নাই তো? মাঝে মাঝে নাতি-নাতনিদের ছেলের ছোটবেলার গল্প শোনান। কাছে না থাকলে অসুস্থ্য শরীর নিয়েও প্রতিদিন ফোন করেন, ছেলের শরীরের খবর নেন। এ ভাবেই নিজের কথা বললেন নড়াইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন, পিপিএম (বার),জানান মমতাময়ী বাবা মায়ের নিরলস চেষ্টার কারণেই: আজ আমি এসপি। পৃথিবীর সবকিছু বদলায়, বদলায় না শুধু সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের নিঃস্বার্থ ভালবাসা। আমি ধন্য যে সৃষ্টি কর্তা আমাকে এমন দুটি সম্পদ দিয়েছেন যাদের জন্য আজ আমি আপনাদের সেবা করতে পারছি। আপনারা দেখেন এখন আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা। এখন আর কাউকে বৃষ্টি-কাদার জন্য স্কুলে যেতে সমস্যা হয় না। সমাজের অনেক বাবা-মা আছেন যারা অনেক অর্থের মালিক। তারপরও অনেকের সন্তান পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই আমি সৃষ্টি কর্তার কাছে কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে এমন দুটি অমূল্য সম্পদ দিয়েছেন যাদের জন্য আজ আমি আপনাদের সামনে বর্তমান অবস্থায় আসতে পেরেছি।