ভেজাল গল্প-বনাম-ভেজালের গল্প

3

নূর ইসলাম ॥ ইদানিং আমরা বেশ স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে উঠেছি, শুধু স্বাস্থ্য সচেতনও বা বলছি কেনো, বলা যায় ভেজাল বিরোধী একটা মনোভাবও আমাদের তৈরি হয়েছে। পারতপক্ষে আমরা কেউ’ই ভেজাল পছন্দ করিনা। ভেজালকারীকে সমাজের নিকৃষ্ট হিসেবে ঘৃণা করি এবং যতটা সম্ভব ভেজাল এড়িয়ে চলার চেষ্টাকরি সেই সাথে ভেজালকারী যাতে উপযুক্ত শাস্তি পায় সেই চেষ্টা ও সমর্থন করি।
ঠিক একারণেই ভেজাল বিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দিয়ে বেশ’কজন সরকারি চাকুরে জাতীয় হিরো হয়েছেন।
ভেজাল বিরোধী অভিযান যখন তুমুল জনপ্রিয়, তখন আমাদের জেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন আমার এক বড় ভাই। বয়সে আমার থেকে বড় হলেও আমাদের মধ্যে সম্পর্কটা ছিল বন্ধুত্বের মতো,
প্রতিদিন অন্তত দু’বার আমাদের মধ্যে কথোপকথন হতো। আলোচনার বেশি অংশ থাকতো তার দীর্ঘ চাকরি জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে, বড় বড় অফিসারদের সাথে বড় বড় অভিযানে থাকার সৌভাগ্য ও অভিজ্ঞতার বর্ণনা। দীর্ঘ চাকরিজীবনে সরকারি ও এনজিও খরচে দেশকে ভেজাল মুক্ত করার বেশ কয়েকটি প্রশিক্ষণের সার্টিফিকেটও অর্জন করেছেন তিনি। ফলে ভেজাল বিরোধী অভিযান তার মতো সার্টিফিকেটধারী অভিজ্ঞ ইন্সপেক্টর ছাড়া একেবারেই অচল।সরকারি রুল অনুযায়ী তার থাকারও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। যেকারণে মাসের অধিকাংশ দিন সাহেবদের গাড়ীতে থাকতে হয় ভেজাল বিরোধী অভিযানে। এতে তার কিছু বাড়তি উপার্জন হলেও ব্যাপক ধকল পোহাতে হয়, যা তার মোটেও সহ্য হয়না,তাই মাঝেমধ্যে ত্যাক্তবিরক্ত হয়ে আমার কাছে উগরে দিয়ে কিছুটা হালকা হতেন। যেদিন কোনো হোটেল রেস্তোরা বা বেকারিতে মোটা দাগের জরিমানা করতেন পরদিন সকালে এসেই আমাকে বলতেন নূরইসলাম কাগজ দেখেছ? আমি না বললে তার মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে যেত, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বলতো কাগজ খুলে দেখো গতকাল অমুক বেকারিতে কুড়ি হাজার টাকা জরিমানা করেছি, স্যারতো ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করতে চেয়েছিল আমি স্যারকে রিকোয়েস্ট করে কুড়ি হাজার টাকা করেছি, কি করবো বুঝলে নুর ইসলাম, গরীব মানুষ, হাতেপায়ে ধরা শুরু করলো, কিন্তু বদমাশটা যে অপরাধ করেছে তা ক্ষমা করা যায়না। আমি না থাকলে জেল জরিমানা দুটোই হতো, বদমাশটা পোড়া মবিল দিয়ে চানাচুর ভাজে! এরা কি মানুষ! আমরা নিজেরাও তো ঐ ভাজা খাই। স্যার তো কারখানা সিলগালা করে দিতে চাইছিল, স্যারের কাছে মাফ চেয়ে রক্ষা পেয়েছে, স্যার খুব ভালো তাই ক্ষমা করেছে, আগের স্যার থাকলে বাঁচতে পারতো না।
সাধারণত আমি তার কথার মধ্যে কথা বলি না, হ্যা, হু, করে সায় দিয়ে যাই, মাঝেমধ্যে তার কথাকে অভ্রান্ত প্রমানে কিছু কথা বলি। কিন্তু পোড়া মবিল দিয়ে চানাচুর ভাজার কথা শুনে মুখ ফসকে বলেই ফেললাম, ভাই, পোড়া মবিল দিয়ে কি চানাচুর ভাজা যায়? যায় তো! আমি নিজের চোখে দেখেছি! স্যারও দেখেছে, পোড়ামবিল দিয়ে চানাচুর ভাজলে মচমচে থাকে! শুধু তাই নয়, পোড়ামবিল দিয়ে জিলেপিও ভাজতে দেখেছি! জিলেপি মচমচে রাখার জন্য পোড়ামবিল দিয়ে ভাজে ওরা!
আমি বললাম ভাই আপনার কথা আমি মানতে পারলাম না, আমি যতটুকু বুঝি মোবিল পিচ্ছিল পদার্থ, দাহ্য পদার্থও বলতে পারেন, (মূলতঃ নাম: লুব্রিকেন্ট, মবিল মূলতঃ কোম্পানির নাম) মোবিলে কেরোসিনের মতো ঘ্রাণ পাওয়া যায়, পোড়ামবিল দিয়ে ভাজলে তা কালো হতে বাধ্য, এটা দিয়ে যে কোনো ভাজাভুজি করলে তা কেউ খেতে পারবে না, আপনার মনে হয় কোথাও ভুল হচ্ছে।
আমি এভাবে তার কথার বিরোধীতা করবো এর জন্য সে হয়তো প্রস্তুত ছিল না, আবার আমার যুক্তিও সে অগ্রাহ্য করতে পারছিল না, তাই অনেকটা অপ্রস্তুত ও মনঃক্ষুণ্য হয়ে বললেন, তুমি নিজের চোখে দেখনি তাই তোমার বিশ্বাস হচ্ছে না, আমারও বিশ্বাস হচ্ছিল না, আমি নিজের চোখে না দেখলে হয়তো তোমার মতোই বলতাম, ম্যাজিস্ট্রেট স্যার তো নিজেই পরিক্ষা করে দেখেছে! ভোক্তা অধিকার, বিএসটিআই এর অফিসার, সাংবাদিক, পাবলিক সবাই দেখেছে পোড়ামবিল দিয়ে চানাচুর ভাজে! আমরা সেখানে আধা টিন পোড়ামবিল পেয়েছি!।
যাই হোক আমি আর কথা বাড়ালাম না,
ইন্সপেক্টর সাহেবও কথা না বাড়িয়ে তাড়া আছে বলে বিদায় হলেন।
আসলে পোড়ামবিল সদৃশ্য যে তরল পদার্থ তারা দেখেছেন তা আসলে পোড়া তেল, কয়েকবার ব্যবহার করার ফলে তেলের রঙ অনেকটা পোড়ামবিলের রূপ ধারণ করেছে।
এই পোড়া তেলে ভাজাভুজি করা খাদ্য স্বাস্থ্যের জন্য কতটা অস্বাস্থ্যকর তা আমি জানি না। তবে বেকারি ও হোটেল রেস্তোরাঁর রসুইখানা যেহেতু নবাব সিরাজউদ্দৌলার রসুইখানা নয়, তাই নবাবেরর মতো একমন ঘি দিয়ে একবারই একটা পরোটা ভেজে বাদবাকি ঘি ফেলে দেওয়া সম্ভব না। আমরা গরম কালে পান্তা ভাত আর শীতকালে কড়কড়া ভাত খেয়ে বড় হয়েছি। হাল আমলের রুটি পরোটা পান্তাভাতের জায়গা দখলে নিলেও গ্রামীণ সমাজে পান্তাভাত এখনো উঠে যায়নি। এখনো রাতের অবশিষ্ট তরকারি দিয়েই সকালের পান্তা খাওয়া হয়। যদিও স্বাস্থ্য বিজ্ঞান যেমন এই খাবার গুলো এ্যালাও করেনা, তেমনি আইনের দৃষ্টিতে এগুলো বাসি খাবার হিসেবে চিহ্নিত। অবশ্য অর্থের বিনিময়ে যেসব খাবার রান্না ও বিপণন করা হয় তা স্বাস্থ্যবিধি মেনে করাটা যেমন বাঞ্ছনীয় তেমনি মানুষের প্রত্যাশাও বটে। এক্ষেত্রে কোনরকম ছাড় দেওয়ার পক্ষে যত যুক্তিই দেখানো হোক না কেনো তা যুক্তিসংগত হতে পারে না। তাই বলে পোড়া তেলকে পোড়ামবিল বানিয়ে জরিমানা আদায় করাটাও আমার কাছে যুক্তিসংগত মনে হয়না। আমি মনে করি প্রকৃত তথ্যের উপর ভিত্তি করেই তার শাস্তি নির্ধারণ করা উচিত।
আমার ধারণা বাঙালি খাবার ছিল খুবই সাদামাঠা, ভাত মাছ শাকসবজি কদাচিৎ মাংস, এসব খাবারের রান্না ছিল আরও সাদামাঠা, তেল নুন ঝাল হলুদ ছাড়া অন্য মসলার ব্যবহার ছিলনা বললেই চলে, মাংস রান্নার সময় কেবলমাত্র গরম মসলার ব্যবহার করা হতো। ভারতীয় সমাজে বিভিন্ন জাতিসত্তার আগমনে অন্যান্য সবকিছুর মতই আমাদের খাদ্য, খাদ্যাভ্যাস রান্না ও রান্না প্রণালীতে বিভিন্ন মসলার ব্যবহার যুক্ত হয়েছে। রান্না হয়ে উঠেছে শিল্প, রাঁধুনিরা হয়ে উঠেছে শিল্পী, একজন দক্ষ শিল্পীর মতোই রাঁধুনিরা বিভিন্ন মসলা দিয়ে রান্নাকে আরও সুস্বাদু করে চলেছে যার হদিস হয়তো আমাদের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর আর তার স্যার বড় সাহেবরা রাখেন না, অথচ তারা রান্না ঘরের বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে জরিমানা করে থাকেন।
একবার পত্রিকায় দেখলাম, বড় বড় হরফে ছাপা হয়েছে অমুক মিষ্টির দোকানে খাবার সোডা দিয়ে রসোগোল্লা বানানোর অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত দশ হাজার টাকা জরিমানা করেছে! আমার মতে রসোগোল্লা তৈরির উপকরণ সম্পর্ক কোনো ধারণা না থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত এই রায় দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে ২০১২ সালের ২ রা মে দিনাজপুরের বেকারি মালিকদের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের কয়েকটি বিধানের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করা হয়, একই সাথে অপর আর একটি রিটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার ক্ষেত্রে খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও পরীক্ষার জন্য যন্ত্রপাতি সঙ্গে রেখে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা চাওয়া হলে ৮ মে হাইকোর্ট রুলসহ অন্তবর্তীকালীন আদেশ দেন। আমি মনে করি ন্যায় বিচার ও আইনের সঠিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে হাইকোর্ট যথার্থ অনুধাবন করেছে। যদিও ভবন নির্মাণ আইনের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০১১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এসথেটিক প্রপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানকে ভ্রাম্যমাণ আদালত ৩০ দিনের বিনাশ্রম কারাদ- দেওয়ায় মোবাইল কোর্ট অ্যাক্ট-২০০৯ এর কয়েকটি ধারা ও উপধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ১১ অক্টোবর হাইকোর্টে রিট করলে দীর্ঘ শুনানি শেষে ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের ১১টি বিধান সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে ঘোষণা করেন।
উচ্চ আদালত তার রায়ে স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান অসাংবিধানিক। তাই ২০০৯ সালের ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের আওতায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা যাবে না।
একই সঙ্গে রিট আবেদনকারীদের সাজা অবৈধ ঘোষণা করে জরিমানার অর্থ ৯০ দিনের মধ্যে ফেরত দিতে বলা হয়। অবশ্য
হাইকোর্টের দেওয়া ওই রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদন চেম্বার বিচারপতি মঞ্জুর করে পুনরায় শুনানির জন্য আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠালে ভ্রাম্যমাণ আদালত আবারও প্রাণ ফিরে পায়। হয়তো এভাবেই আইনের মারপ্যাঁচে আরও কয়েক যুগ ভ্রাম্যমাণ আদালত জীবিত থাকবে। তা থাকুক তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। আর আপত্তি থাকলেও তাতে শংশ্লিষ্ঠদের কিছু যায় আসে না। তবুও একজন প্রজা হিসেবে আমার চাওয়া ভেজাল আর বিষাক্ত খাদ্যে এই মহাউৎসব বন্ধ করতে এবং সমাজের সর্বত্র অব্যবস্থাপনা সহ বেআইনী কার্যকলাপের রেষ টেনে ধরার জন্য ভ্রাম্যমাণ আদালতের অবশ্যই প্রয়োজন আছে, তবে তা একপাক্ষিক আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নয়। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে অভিযুক্তকেও আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ দিতে হবে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতকে যদি আদালত বলা হয় তাহলে অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার আছে তার পক্ষে নিজে অথবা আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থন করার। আদালত নিজে সব দায়িত্ব নিয়ে একতরফা রায় দিলে ন্যায় বিচার হয় কিনা তা শংশ্লিষ্ঠদের ভেবে দেখতে হবে। তাছাড়া আরও একটি বিষয় আমার মনের মধ্যে খচখচ করে, ভ্রাম্যমাণ আদালতে জরিমানার টাকা তাৎক্ষনিক ভাবে আদায় করার কথা বলা হয়েছে। আমি মনে করি বি আর টি এ আইনে যানবাহনের ক্ষেত্রে ট্রাফিক পুলিশ যেভাবে শংশ্লিষ্ঠ ধারায় জরিমানা করে সিলিপ ধরিয়ে দেওয়া হয়, তদ্রুপ ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা অভিযুক্তকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ট্রেজারিতে জমা অথবা আইনী চ্যালেঞ্জ করার বিধান থাকা উচিত। প্রজাসাধারণের স্বাস্থসম্মত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে শুধু হোটেল রেস্তোরায় ক্ষণে ক্ষণে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে জরিমানার টাকা আদায় করে কিছু নকল কারখানায় সিলগালা করলেই হবে না, বড় বড় কোম্পানি গুলোর স্টান্ডার্স সীল মারা চোখ ধাঁধানো রঙ্গিন মোড়কের মধ্যে যে খাবার গুলো দেশের আনাচে কানাচে হায়েনার মতো হা করে আছে, ধান চাল শাক সবজি ফলমূল মাছ মাংস ডিম অতি উৎপাদনের হাতছানি দিয়ে যারা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার মুনাফা ঘরে তুলতে আমাদের বিষ খাওয়ায়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে সেদিকেও নজর দিতে হবে। পারবে কি? আমাদের ভ্রাম্যমাণ আদালত সেই চৌকাঠের ছায়া মাড়াতে?। হিরক রাজার দেশের প্রজা হিসেবে আমি চাই ভ্রাম্যমাণ আদালত যুগযুগ ধরে টিকে থাকুক এবং রাঘব বোয়ালদের দরজায় কড়া নাড়–ক।