গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐহিত্যগুলি আজ বিলুপ্তির পথে

3

নব কুমার সাহা ॥ গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকির কদর আগের মতো আর নেই। বিদ্যুৎচালিত যান্ত্রিক যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অতল গহবরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঢেঁকি। তবে এক সময় এই ঢেঁকি দিয়ে চাল, আটা, ডাল ভাঙ্গা, সিদল (ছোট মাছ আর কচুর ডেরা সমন্বয়ে) তৈরি করা হতো। কিন্তু আজ ধানকল, আটাকলের ব্যাপক প্রসারের ফলে অস্তিত্ত সংকটে পড়েছে ঢেঁকি। এখন আর আগের মতো গ্রামাঞ্চলে ঢেঁকি খুঁজে পাওয়া যায় না। ঢেঁকির ঢক-ঢক শব্দ এখন শুধুই মাত্র নানি-দাদির গল্পের খোরাক। আগে গ্রামের বধূরা ধান ভানিয়ে চাল তৈরি করে নানা রকম সুস্বাদু পিঠা তৈরি করতো। এ সময় বধূরা নানা রকম কিচ্ছা-কাহিনী, খোশ-গল্প, গীত করতো, বিশেষ করে বিয়ের হলদি ভানার সময় এলাকার ‘‘হলদি ভানি মাখোরে মোর সখির গায় ’’ করে কোলাহল করতো। এখন নতুন প্রজন্ম ঢেঁকি শব্দটি শুনলে জানতে চাই ঢেঁকে কি। তারা জানে না ঢেঁকির সেই গৌরবময় অতীতের কথা। লক্ষণীয় বিষয় এটাই যে, গ্রামাঞ্চলে এখন ধান, আটা, হলুদ, মরিচ, ডাল ভানা হয় যন্ত্র চালিত কলে। তাই ঢেঁকি পাওয়া এখন দুষ্কর। কালে ভদ্রে যদিও ঢেঁকি চোখে পড়ে তাও পিঠা ব্যবসায়ীদের ঘরে। নানি-দাদির মুখে শুনেছি, ঢেঁকির তৈরি আটার পিঠার স্বাদ খুব ভাল। কলের যন্ত্রে যে আটা বানানো হয় এসব পিঠা স্বাদতো দূরের কথা গন্ধ আসে। কিন্তু কি আর করার তার পরেও মানুষ শীত মওসুমে বাজারের পিঠা খেয়ে শীত পিঠার স্বাদ গ্রহণ করে। এব্যাপারে গ্রামের অনেকেই জানান, শুধু ঢেকি কেন, আগে গ্রামের প্রতিটি বাড়িই ছিল মাটির তৈরী চৌচালা খড়ের ঘর। এখন গ্রামের কোথায় ঘুরে একটি মাটির ঘর পাওয়া যাবে না। সবাই এখন ইট-পাথরের ঘর বানাতেই ব্যাস্ত। এখন আর গ্রামের মা-বোন-বধূদের মাটির ঘর লেপতে হয় না। ইটের ঘর একবার রং করে বছর কে বছর থাকবে কেনই বা সপ্তাহে বা মাসে অথবা নূতন ধান উঠলে ঘর লেপতে যাবে বলেন? কিন্তু আমরা যারা মাটির ঘরে মানুষ হয়েছি সেই ঘর ছিল আমাদের কাছে স্বর্গ। এখন শহুরে মানুষ অতিরিক্ত গরমে নাকি ঠান্ডার মেশিন লাগায়। আমাদের সময় ঠাঁটা রোদে পুড়ে বিলে-খালে কাজ শেষে যখন ঘরে এসেছি তখন মাটির কলসির একবাটি পানি খেয়ে সেই মাটির ঘরে যখন ঢুকেছি তখন মনে হয়েছে এটিই বুঝি আমার জান্নাত।
থেকেই আমাদের বাপ-দাদারা একশ-দেড়শ বছর বেঁচে ছিলেন। আর এখন কি আধুনিকতার সময় মানুষ বাঁচে নাকি পঞ্চাশ-ষাট বছর। তা হলে এই আধুনিকতা আমাদের কি দিচ্ছে? আয়ু কেড়ে নিচ্ছে নাকি? বুঝি না বাপু। কথাগুলি বলছিলেন গ্রামের কিছু মুরোব্বি। গ্রাম ঘুরে অনেকের সাথে কথা বলে জানা গেল, শুধুমাত্র মাটির ঘর বা ঢেঁকি নয় ধীরে ধীরে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী গরুর গাড়ি ঘানি শিল্প, ধুপ শিল্প, খয়ের শিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। যা এক সময় গ্রাম-বাংলার মানুষের ঘরে ঘরে ছিল। গ্রামের কিছু মানুষ এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন আপনারা কি শুধুমাত্র লেখেন নাকি এগুলি কি বাঁচিয়ে রাখতেও পারেন? প্রশ্নের উত্তরটি দিতে পারি নি। তবে প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছি।