ছোট জীবন

2

লিমার বয়স ১৬ ছুঁইছুঁই । বাসায় ওর মা, বাবা আর একটা ছোট ভাই। বাবা ছোট খাট একটা ব্যবসা করেন তাতে চার জনের সংসার ভালভাবে চলে যায়। স্কুলে পড়ে লিমা। তার নিস্পাপ আর সরলতার জীবনে কালকের খুব সাধারন একটা ঘটনায় লিমা আজথেকে থেকে যা ভাবছিল, তা সব অগোছালো আর এলোমেল ভাবনা। কৈশোর আর তারুণ্যের মাঝামাঝিতে বাস করা মেয়েটি যেন একটা নতুন জগতে প্রবেশ করলো।
ওর মামাতভাই পারভেজ। ওদের বাসায় আসে কাজে অকাজে। কালও এসেছিল। যাওয়ার সময় ওর হাতটা হঠাঁৎই ছুঁয়ে দিল। লিমা যখন চমকে উঠে হাত সরাতে যাবে, তখন পারভেজ হাতটা চেপে ধরল। কয়েক সেকেন্ড। এরপরই ‘ফুপু যাই’ বলে সে চলে গেলো অদ্ভুত একটা দৃষ্টি দিয়ে লিমার দিকে। সেই থেকে লিমার সমস্ত চেতনায় অদ্ভুত এক আতংক খেলা করছিল। সাথে একটা ভাল লাগাও। ওই দৃষ্টির মানে সে জানে না; জানে না মুহূর্তের মাঝে হাত এত গরম হয়েগেলো কেন। শুধু টের পাচ্ছিলো ওর শরীর কাঁপছে ! পারভেজের বয়স ওর চেয়ে একটু বেশি, বছর দুয়েকের বড় হবে। কলেজে যাচ্ছেসবে মাত্র। আত্মীয়তার সুবাদে ওকে কখনো লিমার অন্য কিছু মনে হয়নি। ওর কাছে লিমা ওর নিজস্বতায় সহজ সরল। জড়তা নেই কোন। কিন্তু ওর মন কালকের ঘটনার যে ব্যাখ্যা দিচ্ছিল তাতে ওর শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছিল। ক্রমাগত। রাতে নির্ঘুম কাটিয়ে সকালে স্কুলের জন্য তৈরি হতে গিয়ে সব

এলোমেলো হতে লাগলো। হাত কেঁপে জিনিস পড়ে যাচ্ছিল। কয়েকবার মার বকুনিও খেল। ওর মনে একটা ভাবনাই বাসা বেধে ছিল, রীতাকে কি বলবে এটা? রীতা ওর স্কুল বান্ধবী। সব সময় দুজন গাঁটছড়া বেধে থাকে। ‘না থাক।‘ ভাবল লিমা। আবার মনে হয় বলি। কাউকে বললে হাল্কা লাগবে। কিন্তু এমন কিছু তো হয়নি রীতাকে বলার মতো। ও যদি বলে, লিমা খামোখাই ভেবে মরছে? নির্ঘাত লজ্জা পাবে সে। থাক। স্কুলে যাবার পথে রাস্তার পাশে পারভেজকে দেখে ও চমকে উঠলো। লুকাতে চাইল নিজেকে। কোথায় লুকাবে এই ভরা রাস্তার মাঝে? আসলে কি সত্যিই ও লুকাতে চাইছে নাকি নিজেকে আরও প্রস্ফুটিত করতে চাইছে পারভেজের কাছে? জানে না। শুধু আবিস্কার করলো, পারভেজ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। ওর শরীর অবশ তখন। কাঁপা গলায় জানতে চাইল, কি ব্যাপার এই রাস্তায় পথ আটকালে যে?’ পারভেজ এক দৃষ্টিতে খানিকক্ষণ চেয়ে জানতে চাইল, ‘একটু কথা বলা যাবে?’ লিমা জোরে হাঁটতে শুরু করলো আর কাপা গলায় বলল, না এখানে না, বাসায় এসে বল। ‘অনেকটা দৌড়ে লিমা চলে গেলো পারভেজের চোখের আড়ালে। পারভেজ বুঝল এভাবে হবে না। খুবই ভীতু এক মেয়ে। পরদিন। আবার সেই একই জায়গায় তার জীবন এলোমেলো করে দেয়া সেই ছোট বেলার খেলার সাথী পারভেজ।! আজ কোন কথা বলল না। হেঁটে এসে লিমার হাতে একটা কাগজ গুজে দিয়ে চলে গেলো একবারও পিছন ফিরে না তাকিয়ে। লিমা কাপছিল। ভয়ে আর অজানা কোন ভাল লাগায়। খুলল কাগজ । লেখা ষ ড়াব ুড়ঁ. লিমার মন ঠিকই জানত এতে কি লেখা। সেই মনই তার শরীরটাকে কাপিয়ে দিতে চাইল অজানা এক ভাললাগায়, আর ভালবাসায়। পারভেজ তাকে ভালবাসে! কবে থেকে! সাহস কী করে হোল তার! কি করবে লিমা এখন! ওর ইচ্ছে হোল প্রান ভরে কাঁদতে! কেন? নিজেই জানে না। কাগজটা তড়িঘড়ি করে ব্যাগে ভরে স্কুলে গেলো লিমা। কিন্তু মন পড়ে রইল ছোট এক চিরকুটে, ‘ভালবাসি’ ! পরদিন আর তার স্কুলে যাওয়ার সাহস হোল না। মাথা ব্যথার ভান করে সারাদিন বিছানায়। কেউ বুঝবে না কী ঝড় বইছে তার মনে। কেউ বুঝবে না জীবনের প্রথম ভাললাগার এই মুহূর্ত…ভেবে চলছিল আনমনে। বিকেলে পারভেজ হাজির বাসায়। ও ভয়ে নিজের রুমে গিয়ে লুকাল। যদি উত্তর চায়! ঠিক। সে এসে সামনে দাঁড়ালো। ‘কি রে! তোর নাকি মাথাব্যথা? ফুপু বলল। স্কুলে যাসনি কেন। আমাকে রাস্তায় দাড় করিয়ে রাখলি আর এখন আবার কথা বলছিস না। ‘তোর উত্তর জানাবি না? লিমা নিজের অজাস্তেই বলে ফেলল, তুমি বোঝো না? পারভেজ বোধ হয় এতটা আশা করেনি। বলল, মুখে বল। লিমা না না করে একসময় বলেই ফেললো আমিও তোমায় ভাল বাসি! এ কিশোরী তো জানে না এ কোন সর্বনাশা খেলায় সে নেমেছে। কিশোরী জানে না কি ভয়ানক আর ভয়াবহ এ ঝড়। সব ওলট পালট হয়ে যেতে পারে। মা বাবা! সমাজ! স্কুল! , সবাই চোখ রাঙাবে! কিন্তু বিবেক কি তার কাজ করে’ যখন আবেগ এসে জায়গা করে নেয় সেখানে। এ কয় মাস লিমার মনে হোল সে বাতাসে উড়ছে। সব ভাল লাগে। গান কবিতা সিনেমা। স্কুলে ক্রমাগত খারাপ রেজাল্ট তাকে লজ্জায় ফেলছে না, সে উড়ছে তো উড়ছেই। পারভেজ কয়দিন আগে তার বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। প্রথম দর্শনেই কেন জানিনা লিমার মনে হোল, ইয়াসিন তাকে একটু অন্য চোখে দেখছে। তার দৃষ্টিতে প্রশংসা , খুব দুষ্টমি করতে লাগলো লিমার সাথে। কথাচ্ছলে রুপের প্রশংসাও করলো। লিমার নিজেকে রানী মনে হতে লাগলো। অনেকের মাঝে সে একজন মাত্র। সবার চোখ , চার জনের চোখই তার দিকে। সে সদর্পে হেঁটে বেড়াচ্ছিল, গুনগুন করে গান গাচ্ছিল। এরই মাঝে হঠাৎ ইয়াসিন একদিন বলল, লিমা আমার মনেহয় পারভেজকে তুমি এখনি বিয়ে করে ফেল। মানে? লিমার প্রশ্ন। ‘দ্যাখ তোমার মা বাবা এ বিয়েতে রাজি হবে না। তারচেয়ে নিজেরা করে ফেল, একদিন সময় হলে তাদের বল। ‘পারভেজ তোমাকে এটা বলেছে? লিমা জানতে চাইল। ‘হুম’ ইয়াসিনের উত্তর। লিমার আবার নির্ঘুম রাত শুরু হোল। এ এমন এক সম্পর্ক যা শুধু সামনেই আগায়, পিছিয়ে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই। সব কিছু, বাবা মা ভাই স্কুল সব ওর কাছে তুচ্ছ হতে লাগলো। এই কিশোরীর জীবন স্বপ্নে ঢাকা পড়লো। সে রাজি হোল! ঠিক হোল দাদির বাসায় যাবার কথা বলে লিমা ব্যাগ হাতে বের হবে, ওরা চার জন ওকে নিয়ে যাবে। কোথায়-লিমা তা এখনও জানে না। জানার দরকার কি। পারভেজ আছে না! বাবা, ‘দাদিকে দেখিনা অনেকদিন। যাব একটু দেখতে?’ লিমার আবদার। একা? বাবা জানতে চাইল। ঠিক আছে তোকে আগিয়ে দিয়ে আসি। লাগবে না বাবা। রীতা থাকবে। ও আছছা। যা মা, পৌঁছে জানাস। বিকেলে সেই গাছটার নীচে এসে দাঁড়ালো লিমা। যেমন ওকে বলা হয়েছিল। একটু পড়ে ইয়াসিনকে দেখা গেলো। পারভেজ আসেনি? জানতে চাইল লিমা। নাহ, ওকে কেউ দেখে ফেলতে পারে। চল। ‘কোথায়? চলই না, গিয়ে দেখবে কিভাবে সাজিয়েছি তোমাদের বাসর ঘর। লজ্জায় লিমা লাল হয়ে উঠলো। এই চুপ করবে, আদুরে ধমক তার ! ইয়াসিন তাকে নিয়ে এক নৌকায় উঠালো। কোথায় যাচ্ছি? বড় সরল সে প্রশ্ন। যাচ্ছি না তো। ইয়াসিনের উত্তর। তুমি কি সত্যি ভাবছ পারভেজ তোমায় বিয়ে করবে? মানে, লিমা ধাক্কা খেল। তাহলে এনেছ কেন এখানে? এই পারভেজ তুমি চুপ কেন? এতক্ষণে পারভেজ মুখ খুলল। লিমা কিছু মনে করো না। আজ আমরা ফুর্তি করব তোমার শরীর নিয়ে। এই নৌকায়। তোমার ভাল লাগবে। মুহূর্তে লিমার শরীর অবশ হয়ে গেলো ! নাহ এবার আর ভাল লাগায় না , ভয়ে-ভীষণ ভয়ে। ও চিৎকার করে ওঠার সাথে সাথে ইয়াসিন ওর মুখ চেপে ধরল। বাকি দুই জন জামা খুলতে লাগলো, পাজামাও। লিমার গায়ে কোন শক্তি রইল না। চারটা দানব তখন ফুর্তিতে মেতেছে। আছছা সময় এত লম্বা হয় কেন? বাবা কি করছে এখন? মা? ভাই? তারা কি জেনে গেছে সে দাদির বাসায় যায়নি। এত ব্যাথা কেন! লিমার অসংলগ্ন এই ভাবনা ওকে ধীরে ধীরে নিস্তেজ করে ফেলছিল। এই ছিল ওদের মনে! হায়! ভালবাসা! বিয়ে!! কাঁদতে কাঁদতে ও শুধু বলছিল, আমাকে বাড়ি যেতে দাও। মা চিন্তা করবে। চার হায়েনার হাসি, তোকে বাড়ি পাঠালে আমাদের ফাসি হবে। শেষ বারের মত পৃথিবী টাকে দেখে নে। ‘লিমা এই প্রথম উপলব্ধি করলো আজ তার বিয়ে নয়, জীবনের শেষ দিন। ওর গলা যখন ইয়াসিন চেপে ধরে শ্বাস বন্ধ করে ফেলছিল, শুধু ও একবার বলল মা, আমায় ক্ষমা করো। আস্তে আস্তে একটা তরতাজা শরীর নিস্তে হয়ে গেল। নিষ্প্রভ হয়ে গেলো ছোট একটা প্রাণ, যার বয়স ১৬ ছুঁয়েছিল সেদিন ! ওরা আর দেরী করলো না। লিমার সাথে করে আনা কালো ব্যাগটা আর ওর উলঙ্গ শরীর ওরা ফেলে দিল পানিতে। বড় অযতেœ, অবহেলায়। দুই দিন পর বাবা জানতে পারল লিমা দাদি বাড়ি যায়নি। ভীষণ উদ্বিগ্নতায় বাবা সবাইকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে লাগলো লিমাকে কেউ দেখেছে কিনা! সবার না উত্তরে বাবা মা ভেঙে পড়লো অজানা এক আশংকায়। এর মাঝে ৩য় দিনে একজন জানাল লিমাকে সে এক ব্যাগ হাতে ইয়াসিনের সাথে যেতে দেখেছে! বাবা চমকে উঠলো। ব্যাগ নিয়েই তো সে বের হয়েছিল। আর পারল না সে। থানায় গিয়ে বলল সব। পুলিশ বের হোল। ইয়াসিন ধরা পড়লো সেদিনই।। পুলিশের জেরার মুখে স্বীকার পেল সব। ধরা পড়লো একে একে চার জন।। উদ্ধার হোল লিমার ফুলে ফেঁপে ওঠা লাশ। হায় কিশোরী! ভালবাসা কি এতই সহজ? তুমি কি একে সিনেমার গল্প ভেবেছিলে? ভেবেছিলে যা সুখের যা আনন্দের, তার সব টুকুই নিখুঁত আর সহজ লভ্য? কি ভেবেছিলে তুমি! এ সমাজ থেকে হায়েনার দল সব হারিয়ে গেছে? কি ভেবেছিলে বিশ্বাসের জায়গা সব সময় আত্বীয় স্বজন? কাকে ভেবেছিলে তোমার ভালবাসা? পানিতে যখন ভাসতেছিলে সব মাছ কি তোমায় বলেছিল, এই পৃথিবীতে সবচেয়ে নিষ্ঠু প্রাণী হোল মানুষ? বলেছিল কি তাদের, মধ্যে সরলতার, বিশ্বাসের স্থান নেই? কিশোরী কি ভেবেছিলে শেষ মুহূর্তটায়? জানতে আর জানাতে বড় ইচ্ছে হয়!
লেখক : নিলুফার শিরিন (জেলা জজ, নড়াইল)