সাবাস চেয়ারম্যান আবুল ইসলামের ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী

17

আবুল কালাম আজাদ, ঝিকরগাছা অফিস থেকে : মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, গণপরিষদ সদস্য, স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য এবং বঙ্গবন্ধুর সাবাস চেয়ারম্যান খ্যাত আলহাজ আবুল ইসলামের আগামীকাল মঙ্গলবার ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী। তিনি ২০০৪ সালের এদিনে হাজার হাজার মানুষকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। নন্দিত নেতা আবুল ইসলাম ১৯৫৫ সালে মৌখিক ভোটে ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর নির্বাচিত হন। শুরু হয় তার জনপ্রিয়তার পথ চলা। ১৯৫৮ সালে ঝিকরগাছার তৎকালীন বল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (বর্তমান নির্বাসখোলা ও হাজিরবাগ ইউনিয়ন) নির্বাচিত হন সরাসরি জনগণের ভোটের মাধ্যমে। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খাঁন মৌলিক গণতন্ত্র চালুর নামে ফরমান জারি করেন ইউপি চেয়ারম্যানদের ভোটে পার্লামেন্ট সদস্য নির্বাচিত হবেন। জনগণের সরাসরি ভোটের দরকার নেই। এবং আইয়ুব খাঁন নির্দেশ দেন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এই ফরমান সমর্থন সূচক রেজুলেশন করে প্রেসিডেন্ট দপ্তরে পাঠাতে। তখন গোটা পাকিস্থানের মধ্যে একমাত্র চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম ওই ফরমানের বিরুদ্ধে উচ্ছারন করলেন। তিনি বল্লা ইউনিয়ন পরিষদের প্যাডে ওই ফরমানের বিরুদ্ধে রেজুলেশন করে প্রেসিডেন্ট দপ্তরে পাঠান। তিনি রেজুলেশনে উল্লেখ করেন, ভোট জনগণের মৌলিক অধিকার তা খর্ব করার এখতিয়ার কারো নেই। চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম ওই রেজুলেশনের কপি স্পিকার ও দৈনিক ইত্তেফাক অফিসে প্রেরণ করেন। এ ঘটনায় তাকে দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সাবাস চেয়ারম্যান শিরোনামে সংবাদ পরিবেশন করে। এরপর থেকে আবুল ইসলাম সারাদেশে সাবাস চেয়ারম্যান নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। তিনি ১৯৬৬ সালে যশোর বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন। খুলনা বিভাগে তিনিই একমাত্র আওয়ামী লীগের মেম্বর নির্বাচিত হন। এবং ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হিসাবে চেয়ারম্যান থেকে অবিভক্ত ঝিকরগাছা চৌগাছাসহ মণিরামপুর নির্বাচনী এলাকার প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। আবুল ইসলাম ১৯৪৯ সাল থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে আবুল ইসলাম সরাসরি অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি দেড়শ সুইসাইড স্কোয়াড নিয়ে যুদ্ধ করেছেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। কিংবদন্তী এই পুরুষ ১৯২৪ সালে যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার হাজিরবাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সরদার নাসিরউদ্দীন তৎকালীন সমাজের পঞ্চায়েত ছিলেন। আবুল ইসলাম ২০০৪ সালের এদিনে হাজার হাজার মানুষকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান। হাজিরবাগ গ্রামের জামে মসজিদের পাশে পারবারিক কবনস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন নন্দিত এই নেতা। আবুল ইসলাম মৃত্যুর আগে বলেছিলেন তাকে যেন বঙ্গবন্ধুর মত ৫৭০ সাবান এবং নি¤œমানের কাপড় দিয়ে দাফন করা হয়। তার শেষ ইচ্ছা পূরণ করেছিল তার সন্তানরা। আবুল ইসলামের সুযোগ্য উত্তরসুরি যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) আসনের সংসদ সদস্য ও সড়ক, পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য এ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির। মরহুম আবুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পারবারিক ও রাজনৈতিকভাবে দিনভর বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষনা করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে মরহুমের কবর জিয়ারত, হাজিরবাগ জামে মসজিদে দোয়া অনুষ্ঠান এবং বিকাল ৩ টায় হাজিরবাগ আবুল ইসলাম মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন চত্ত্বরে বাঁকড়া, হাজিরবাগ, নির্বাসখোলা ও শংকরপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের উদ্যোগে স্মরণসভার আয়োজন করা হয়েছে। স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকবেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য, গণপরিষদ সদস্য, স্বাধীনতার পর প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য অ্যাড. ময়নুদ্দিন মিয়াজি। বিশেষ অতিথি হিসাবে বিশিষ্ট সাংবাদিক, কবি ফখরে আলম, যশোর জেলা, চৌগাছা ও ঝিকরগাছা উপজেলার আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ ও জনপ্রতিনিধিগণ উপস্থিত থাকবেন।

১৯৪৯-২০০৪ বিরতিহীন ৫৫ বছরের আওয়ামী লীগার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সাবাস চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম
এ্যাড. মনিরুল ইসলাম মনির জাতীয় সংসদ সদস্য, যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা)

যখন একটি শিশু জন্ম নেয়, তার দিকে চেয়ে থাকে তার পরিবার। চেয়ে থাকে সমাজ, এলাকা, দেশ তথা গোটা জাতি। জাতির চেয়ে থাকা সে প্রত্যাশা কেউ পূরণ করতে সক্ষম হয়, আবার কেউ সে প্রত্যাশা পূরণ তো দূরের কথা সমাজ বা জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। যারা সমাজ বা জাতির প্রত্যাশা পূরণে সক্ষম হয় তারাই হয় সমাজে সুপূরুষ, তারা হয় সার্থক মানুষ। তেমনি একজন সার্থক মানুষ আজীবন সংগ্রামী মাটি মানুষের সাহসী নেতা মরহুম আলহাজ্ব আবুল ইসলাম। তিনি গোটা জাতির জন্য এক কিংবদী মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছাপ রেখে গেছেন একজন মেধাবী ছাত্র, হাতযশ সম্পন্ন গ্রাম্য ডাক্তার, আদর্শ কৃষক, ইউনিয়ন বোর্ডের মেম্বর, ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, ডিস্ট্রিক বোর্ডের মেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, গণপরিষদ সদস্য, জাতীয় সংসদ সদস্য, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সর্বোপরি একজন দুঃসাহসিক বীর মুক্তিযোদ্ধা। আজ ২০ ফেব্রুয়ারি কিংবদন্তী এ সিংহ পূরুষের ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী। আজ থেকে ১৪ বছর আগে আমরা তাকে হারিয়েছিলাম এ পৃথিবী থেকে।
আবুল ইসলামের জন্ম ঃ কিংবদন্তী এই সিংহপূরুষ জন্মগ্রহণ করেন যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেরার হাজিরবাগ গ্রামে খ্যাতনামা এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯২৪ সালে। পিতা মরহুম নসিমউদ্দীন সরদার ও মাতা মরহুমা কাওসার বিবি। পিতা তৎকালীন সমাজের পঞ্চায়েত ছিলেন। বড় চাচা মরহুম বজলে রহমান সরদার ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট। শৈশবে আবুল ইসলামের শখ ছিল ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট হওয়ার। সে শখ তার পূরণ হয়েছিল। শুধু প্রেসিডেন্ট নয়, পর্যায়ক্রমে তিনি হয়েছিলেন জাতীয় আইন সভার সদস্য।
আবুল ইসলামের শিক্ষাকাল ঃ আবুল ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন কাটে উপজেলার সোনাকুড় সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন যশোর সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনে। তখন নবম থেকে দশম শ্রেণীতে উঠার সময় যারা বাংলায় সর্বোচ্চ নম্বর পেতেন তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বর্ণপদক দেয়া হত। আবুল ইসলাম সেই স্বর্ণপদক পেতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি ১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিক পাস করে অবহেলিত জনগোষ্টীর সেবাদানের জন্য ভারত বর্ষের নাম করা ডাক্তার তার পরম আত্মীয় ডাক্তার মমতাজউদ্দীনের কাছ থেকে ডাক্তারী শিখে ঐ পেশায় জড়িয়ে পড়েন। উল্লেখ্য, ঐ সময় তিনি এক দিন ডাক্তারী পেশা জীবনে সর্বোচ্চ ৬০১/- (ছয় শত এক) টাকা আয় করেছিলেন। যা দিয়ে ঐ সময় ২৫ বিঘা জমি কেনা যেত। ডাক্তারীতে তার হাতযশ ছিল খুব।
জনপ্রতিনিধিত্ব ও সাবাস চেয়ারম্যান ঃ ১৯৫৫ সালে আবুল ইসলাম মৌখিক ভোটে ইউয়িন বোর্ডের মেম্বর নির্বাচিত হন। শুরু হয় তার জনপ্রিয়তার পথ চলা ১৯৫৮ সালে তিনি বর্তমান দুই ইউনিয়ন হাজিরবাগ ও নির্বাসখোলা বৃহত্তর বল্লা ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন সরাসরি জনগনের ভোটে। এরপর ১৯৬২ সালে তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন বৃহত্তর বল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। ১৯৬৪ সালে পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল আয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র চালুর নামে ফরমান জারি করেন যে, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের ভোটে পার্লামেন্ট সদস্যরা নির্বাচিত হবেন। জনগণের সরাসরি ভোটের দরকার নেই। আয়ুব খান নির্দেশ দেন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এ ফরমানের সমর্থনসূচক রেজুলেশন করে প্রেসিডেন্ট দপ্তরে পাঠাতে। তখন গোটা পাকিস্তানের মধ্যে একমাত্র চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম ঐ ফরমানের বিরূদ্ধে রেজুলেশন করে প্রেসিডেন্ট দপ্তরে পাঠান। রেজুলেশনে বল্লা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান উল্লেখ করেন, ভোট জনগণের মৌলিক অধিকার তা খর্ব করার অধিকার কারো নেই। এক মাথা এক ভোট অর্থাৎ পাকিস্তানের জনগণ নির্বাচিত করবে তাদের জনপ্রতিনিধি কারা হবে? চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম রেজুলেশন কপি স্পীকার ও দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রেরণ করেন। দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদক তোফাজ্জেল হোসেন মানিক মিয়া এ খবর ছাপালো লিড নিউজে এবং সাবাস চেয়ারম্যান শিরোনামে। পরের দিন গোটা দেশে রব উঠ যায়। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে আন্দোলন সংগ্রাম করে গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যা না করতে পেরেছে নিভৃত এক পল্লীর দুঃসাহসিক চেয়ারম্যান তা করেছে। সারাদেশে সাবাস চেয়ারম্যানের আলোচনায় মুখরিত হয়ে উঠে। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব জানতে চান যশোরের রওশন আলীর (সাবেক সংসদ সদস্য) কাছে কে এই সাবাস চেয়ারম্যান আবুল ইসলাম। রওশন আলী বঙ্গবন্ধুকে জানালেন সাবাস চেয়ারম্যানের কথা। তিনি আওয়ামীলীগের ঐ ইউনিয়নে নেতা। শেখ মুজিব তখনও বঙ্গবন্ধু হননি। তিনি রওশন আলীকে বললেন ঢাকায় তার সাথে দেখা করার কথা আবুল ইসলামের। তারপর বঙ্গবন্ধু পুনরায় রওশন আলীকে জানান, আমি যশোর আসছি যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রী মরহুম আব্দুল খালেক ভাই এর (মাগুরা) মাজার জিয়ারত করতে তোমার বাসায় সাবাস চেয়ারম্যানকে আসতে বলো। সেখানে সাবাস চেয়ারম্যান আবুল ইসলামের সাথে বঙ্গবন্ধু আনুষ্ঠানিক পরিচয় ঘটে। বঙ্গবন্ধুর সফর সঙ্গী হিসেবে সেদিন যে দুইজন ছিলেন তারমধ্যে বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোঃ জিল্লুর রহমান সাবেক মাননীয় প্রধান মন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী। এ সময় বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে ভেসে উঠে ১৯৫২ সালে ঝিকরগাছার নায়ড়া গ্রামে আওয়ামীলীগের এক জনসভার কথা। সে জনসভায় বঙ্গবন্ধু বাইসাইকেল চালিয়ে এসেছিলেন। আবুল ইসলাম সেই জনসভা পরিচালনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে গেথে যায় সাবাস চেয়ারম্যানের কথা। ঠিক সেই সময় আবুল ইসলাম বল্লা ইউনিয়নের একটি ব্রীজ নির্মাণের টাকা দিয়ে দু‘টি ব্রীজের কাজ সম্পন্ন করেন। যেন সাবাস চেয়ারম্যানের কমতি আর কোথাও রইল না। এ খবরও পত্রিকা ছাপালো সাবাস চেয়ারম্যান শিরোনামে। ১৯৭০ সালে আবুল ইসলাম আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে মনিরামপুর থানার ৮টি ইউনিয়ন ও ঝিকরগাছা (অবিভক্ত চৌগাছা) নির্বাচনী এলাকার প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন, এর আগে ১৯৬৬ সালে আবুল ইসলাম যশোর জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হন, খুলনা বিভাগে তিনি একমাত্র আওয়ামীলীগের ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডেব মেম্বর নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের যশোর-২ আসনের প্রথম জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
মুক্তিযুদ্ধে আবুল ইসলাম ঃ যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রত্যেক গণপরিষদ সদস্যবৃন্দ বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পের পলিটিক্যাল এডভাইজার ছিলেন। গণপরিষদ সদস্য আবুল ইসলাম মহান মুক্তিযুদ্ধে অস্ত্র নিয়ে সরাসরি অংশ গ্রহণ করেন। ৭১-এ তিনি দু‘ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এলাকাবাসিকে সুসংগঠিত ও পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের উচ্ছেদ করতে তিনি ছিলেন সদা প্রস্তুত সে সময় কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে জনমত তৈরী করতে এক বক্তৃতা করেছিলেন। সে বক্তৃতায় অনুপ্রাণিত হয়ে সেখানকার বাসুদেব নামে এক ছাত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে তার দেশে ফেরার পথে অস্ত্রসহ ভারতীয় বিএসএফ এর হাতে আটক হয়। বিএসএফ যখন তাকে ধরে থানায় দিয়েছিল, তখন তার বিধবা মাতা তাকে খোজ পেয়ে ছাড়াতে আসলে সে বলেছিল, মা আমি চুরি, ছিনতাই, ডাকাতী করতে গিয়ে ধরা পড়িনি। আমি গত সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের এক গণপরিষদ সদস্য‘র বক্তৃতা শুনে সেদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে ফেরার পথে ধরা পড়েছি। মাগো তুমি আমাকে ছাড়াতে চাইলে সেই গণপরিষদ সদস্য আবুল ইসলামের কাছে যাও। তখন সন্তানকে ছাড়াতে বিধবা সেই মাতা আবুল ইসলামের কাছে আসলে তাকে নিয়ে তিনি তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায় এর কাছে যান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্র বাসুদেবকে থানা থেকে মুক্ত করেন। তাঁর নির্বাচনী এলাকায় ভ্রাতুষপুত্র মাহফুজুর রহমান হেমসহ ১২জন শহীদ হন এবং রকেট জলিল ও হাজারী লাল তরফদার বীর প্রতীক খেতাব পান। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আবুল ইসলামের বাসা বাড়ির দুই দামাল কাজের ছেলে ইন্তাজ আলী ও আব্দুল মজিদ তার সাথে স্বশস্ত্র যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি গভীর প্রেমত্ব ও মমত্ব ঃ আবুল ইসলামের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি প্রেমত্ব, ভালবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল অকৃত্রিম। আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আওয়ামীলীগ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি একমাত্র ব্যক্তি যিনি বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী একনাগাড়ে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন ১৯৪৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৫৫ বছর। যার স্বীকৃতি স্বরূপ ১৯৯৯ সালে খুলনা বিভাগীয় সমাবেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ক্রেস্ট দিয়ে সম্মানিত করেছিলেন। তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর যশোর ঈদগাহ ময়দানে গায়েবানা জানাজা সংগঠিত করেছিলেন। তার নামে সেসময় হুলিয়া থাকায় তিনি গোপনে যশোর থেকে টুঙ্গিপাড়ায় পায়ে হেঁটে গিয়ে মাজার জিয়ারত করেন। যা ঐ সময় ভাবাও কষ্ট ছিল। বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহতের পর তিনি নিজ গোয়ালের ৭ টি গরু বঙ্গবন্ধুর পরিবারের ৭ জন সদস্যর ( বঙ্গবন্ধু, বেগম মুজিব,শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল, সুলতানা কামাল, রোজি জামাল) নামে কোরবানী করেছিলেন। তার শেষ ইচ্ছা ছিল মৃত্যুর পর তাকে বঙ্গবন্ধুর ন্যায় কাপড় কাচা ৫৭০ সাবান দিয়ে গোসল ও সস্তা থান কাপড় দিয়ে দাফন করা। তার সেই শেষ ইচ্ছা তার সন্তানরা পূরণ করেছিলেন।
আবুল ইসলামের এক সাহসিকতা ঃ আবুল ইসলাম সপরিবারে নিহত হবার আগ দলীয় সংসদীয় কমিটির শেষ সভায় তিনি দুঃসাসিক ভূমিকা রেখেছিলেন। সে সভায় আবুল ইসলাম ফ্লোর নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন দলের মধ্যে অনুপ্রবেশকারী চোর, চাটুকার, দুর্নীতিবাজ ও কালোবাজারীদের কারণে দল ও সরকারের ভাবমুর্তি নষ্ট হচ্ছে। আর এ সব চোর চাটুকার, দুর্নীতিবাজ, কালোবাজারীরা জাতির পিতার সরলতা নিয়ে আপনার পায়ে পড়লে তাদের ক্ষমা করে দেন। আপনার কাছে এসে পা ধরে ক্ষমা পেয়ে যায়। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বঙ্গবন্ধু আপনার দু‘পা গোড়া থেকে কেটে দিব। যাতে চোর, চাটুকার, দুর্নীতিবাজরা আর আপনার পা ধরে ক্ষমা চাইতে না পারে। কারণ সোনার বাংলা গড়তে আপনার নেতৃত্বে মহান মুক্তি সংগ্রামে ৩০ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে আমরা যে দেশ পেয়েছি তার স্বপ্ন বৃথা যেতে দিব না। আবুল ইসরামের এ কথা শুনে বঙ্গবন্ধু টেবিল চাপরে বলেছিলেন সাবাস চেয়ারম্যান আমার। তুমি আমার সোনার ছেলে। তুমি আরও বলো। ৩ মিনিটের নির্ধারিত বক্তব্য আবুল ইসলাম ১৫ মিনিট করেছিলেন। দল , সরকার , দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যেসব কারণে সেগুলো বঙ্গবন্ধুর সামনে অকপটে সাহসের সাথে তুলে ধরেছিলেন। আবুল ইসলাম সততায়, ব্যক্তিত্বে , যোগ্য নেতৃত্বে আর মনেপ্রাণে খাঁটি বাঙ্গালি ছিলেন। তিনি বাংলার কৃষক সমাজকে খুব ভালবাসতেন। আবুল ইসলাম সৎ ও ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক মানুষও ছিলেন। সেকথা এলাকার গন্ডি পেড়িয়ে বঙ্গবন্ধু জানতে পেরেছিলেন। যে কারণে দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রথম সরকারী হজ্জ্ব ডেলিগেট টীমের প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছিলেন আবুল ইসলামকে পবিত্র সৌদি আরবে। আমি করুণাময় পরম দয়ালু আল্লাহ পাকের দরবারে কিংবদন্তী মরহুম আবুল ইসলামের বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।
লেখকঃ মরহুমের ৩য় পুত্র, জাতীয় সংসদ সদস্য, যশোর-২ (চৌগাছা-ঝিকরগাছা) এবং যুগ্ম সম্পাদক, যশোর জেলা আওয়ামীলীগ।